অনলাইন ডেস্ক: তীব্র গরম আর যানজটের ক্লান্তিতে একটু স্বস্তি পেতে ফুটপাতের রঙিন শরবতই যেন পথচারীদের প্রথম পছন্দ। পাশেই হয়তো খোলা কড়াইতে দিনের পর দিন পোড়ানো তেলে ভাজা হচ্ছে মচমচে পেঁয়াজু, জিলাপি কিংবা পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখা চটপটি। কিন্তু এই আপাত লোভনীয় খাবারের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক নীরব ঘাতক। যে খাবার খেয়ে মানুষ তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন, তাতে কিলবিল করছে কোটি কোটি ভয়ংকর ব্যাকটেরিয়া! নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র-স্রেফ এক প্লেট চটপটিতেই মিলেছে ৭ কোটির বেশি ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া, যা মূলত মানুষের মলমূত্র থেকে ছড়ায়। আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর রাস্তার খাবারের ৯০ শতাংশই অনিরাপদ। সারা দেশে ফুটপাতের এই ‘বিষবাণিজ্য’ আমাদের ডায়রিয়াসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগের দিকে ঠেলে দিলেও এ নিয়ে তেমন কোনো তদারকি নেই। খবর দৈনিক যুগান্তর।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, উন্নত দেশগুলোতে ফুটপাতের খাবার শুধু জনপ্রিয়ই নয়, কঠোর স্বাস্থ্যবিধির মধ্য দিয়েই বিক্রি করা হয়। সেখানে নির্দিষ্ট অনুমতি ছাড়া কোনো বিক্রেতা ব্যবসা করতে পারেন না। সরকারি সংস্থাগুলো নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে খাবারের মান নিশ্চিত করে এবং তদারকিও থাকে অত্যন্ত কঠোর। অথচ সেই ধারা অনুসরণ না করে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের স্ট্রিট ফুডের দোকান। চটপটি-ফুচকা থেকে বেকারি আইটেম, লাইভ জুস, ফাস্টফুড সবই মিলছে ফুটপাতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব দোকান গড়ে উঠছে সরকারি ও জনসাধারণের জায়গা দখল করে। নেই কোনো বৈধ অনুমতিপত্র, নেই খাবারের মান যাচাইয়ের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা। তদারকি সংস্থাগুলোর উপস্থিতিও চোখে পড়ে না বললেই চলে। ফলে যে যার মতো করে খাবার তৈরি ও বিক্রি করছে। আর এর মাধ্যমে অজান্তেই ছড়িয়ে পড়ছে নানা রোগের জীবাণু।
রোববার রাজধানীর পল্লবীতে সড়কের পাশে একটি ফুচকার দোকানে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতার উপচে পড়া ভিড়। দোকানটি বেশ সাজানো-গোছানো; কিন্তু যে প্লেটে ফুচকা ও চটপটি দেওয়া হচ্ছে তা চরম অস্বাস্থ্যকর। বিক্রেতার পায়ের কাছে রাখা একটি প্লাস্টিকের বালতি। তাতে কালছে রঙের ময়লা পানি। ক্রেতাদের এঁটো প্লেট ও চামচ সেই পানিতেই বারবার ধোয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পাশ দিয়ে যাওয়া গাড়ির ধোঁয়া ও রাস্তার ধুলা-ময়লা সরাসরি পড়ছে খাবারে। দোকানদারের হাতে কোনো গ্লাভসও নেই। মাঝে মধ্যেই তিনি হাত দিয়ে নিজের শরীর চুলকে আবার খাবারে হাত দিচ্ছেন। পাশেই আরেক দোকানে ভাজা হচ্ছে পেঁয়াজু। কড়াইয়ের তেলের রং পুড়ে আলকাতরার মতো কালো হয়ে গেছে।

শুধু পল্লবীই নয়, রাজধানীর মিরপুর, ফার্মগেট, গুলিস্তান, নীলক্ষেত, মতিঝিল ও উত্তরাসহ শহরজুড়েই ফুটপাতে খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। বেশির ভাগ খাবারের চিত্রই একই রকম। শরবত বা আখের রসে যে বরফ দেওয়া হয়, তার বেশির ভাগই আসে মাছ সংরক্ষণের কারখানা থেকে, যা খাওয়ার সম্পূর্ণ অনুপযোগী। একই তেল দিনের পর দিন পুড়িয়ে ভাজাভুজি তৈরি হচ্ছে, যা ট্রান্সফ্যাটে পরিণত হয়। জিলাপি, বেগুনি বা শরবতের রং আকর্ষণীয় করতে কাপড়ে ব্যবহৃত সস্তা কেমিক্যাল রং মেশানো হয়। এছাড়া খোলা খাবারে সারা দিন গাড়ির বিষাক্ত কালো ধোঁয়া এবং রাস্তার ধুলো মিশে লেড বা সিসার মতো ভারী ধাতু যুক্ত হচ্ছে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি ফুটপাতে বিক্রি হওয়া ছয়টি জনপ্রিয় খাবার গবেষণাগারে পরীক্ষা করে। এগুলো হল-চটপটি, ছোলা-মুড়ি, স্যান্ডউইচ, আখের রস, অ্যালোভেরা শরবত ও সালাদ। রাজধানীর ৩৭টি জায়গা থেকে ৪৫০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি খাবারে ই-কোলাই, সালমোনেলা এসপিপি ও ভিব্রিও এসপিপির জীবাণু পাওয়া গেছে। এগুলো সংক্রামক ব্যাধি ডায়রিয়া ও পেটের নানা পীড়া এবং দীর্ঘস্থায়ী অনেক রোগের কারণ। চটপটিতে জীবাণুর মিশ্রণ অতি উচ্চমাত্রার পাওয়া গেছে। প্রতি প্লেট চটপটিতেই মিলেছে ৭ কোটি ২০ লাখ ই-কোলাই, ৭৫০ সালমোনেলা ও ৭৫০ ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়া। অন্যান্য খাদ্যে একই জীবাণু বিভিন্ন মাত্রায় পাওয়া গেছে।
অস্বাস্থ্যকর খাবার নিয়ে কাজ করেন গবেষক মো. লোকমান হেকিম। তিনি বলেন, ই-কোলাই মানুষের মলে থাকা একটি জীবাণু। ঢাকা শহরে খাওয়ার পানির প্রধান উৎস ওয়াসা। শহরের পানির পাইপ ও পয়ঃনিষ্কাশনের লাইন বহু জায়গায় একাকার হয়ে গেছে। রাসায়নিক ব্যবহার করেও একে পূর্ণমাত্রায় বিশুদ্ধ করা যায় না। ওয়াসার প্রধান নিজেই বলেছিলেন এই পানি ফুটিয়ে পান করার জন্য। কিন্তু ফুটপাতের বিক্রেতারা সরাসরি এ পানি ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক কোনো জ্ঞান তাদের নেই। ফলে খাদ্যের পাত্র জীবাণুমুক্ত রাখার নিয়ম তারা জানেন না। পরিবেশনের জন্য ব্যবহৃত পাত্র, গামছা, এমনকি তাদের হাতও পরিষ্কার থাকে না। এ কারণে মলের জীবাণুসহ আরও বিভিন্ন ক্ষতিকারক জীবাণু মানুষের পেটে যাচ্ছে।

সরকারের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ২০১৭ সালের নভেম্বরে খাদ্যদ্রব্যে রাসায়নিক দূষণ ও জীবাণু সংক্রমণবিষয়ক সমীক্ষা প্রতিবেদন তুলে ধরে। তাতে দেখা যায়, ঢাকার ৯০ শতাংশ রাস্তার খাবারই অনিরাপদ। এর আগে ২০১৫ সালে আইসিডিডিআরবির গবেষণায় ৫৫ শতাংশ রাস্তার খাবারে ক্ষতিকর জীবাণু পাওয়া গিয়েছিল। আর ৮৮ ভাগ বিক্রেতার হাতে অস্বাস্থ্যকর জীবাণুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, রাজধানীর রাস্তার খাবারে বিপজ্জনক মাত্রায় টোটাল কলিফর্মস ও ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। এই ব্যাকটেরিয়া মূলত প্রাণীদের মলমূত্রে থাকে। ঢাকার পথে বিক্রি হওয়া ঝালমুড়ি, পানিপুরি, ভেলপুরি, চটপটি, নুডলস, ফলের রস, তেঁতুল-কাঁচাকলা-জলপাই-ধনেপাতা ও মসলা দিয়ে তৈরি মিশ্র ফলের ভর্তা, কতবেল ভর্তা ও জলপাই ভর্তা পরীক্ষা করে এই ফলাফল পায় সংস্থাটি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ বলেন, ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার এখন নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। সবকিছু চোখের সামনেই হচ্ছে। অথচ প্রতিকার নেই। শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে দীর্ঘমেয়াদি রোগ। এটি শুধু স্বাস্থ্য নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যতের জন্য হুমকি। তিনি আরও বলেন, আইন থাকলেও প্রয়োগ কম। একাধিক কর্তৃপক্ষ নামমাত্র অভিযান চালালেও কঠোর শাস্তির অভাবে অস্বাস্থ্যকর খাবার ও ভেজাল রোধ করা যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে দেশের জনস্বাস্থ্য এক সময় বিপন্ন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। আমাদের বেশকিছু সংকট আছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ল্যাবরেটরি না থাকায় বাইরে থেকে নমুনা পরীক্ষা করাতে হয়। এসব ল্যাবরেটরির সক্ষমতা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এর সমাধানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনায় ল্যাব স্থাপনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এগুলো চালু হলে কার্যক্রম আরও জোরদার হবে।
Leave a Reply